বাংলা কবিতা

বাংলা কবিতা: এক শিল্পের জগতে


বাংলা কবিতা, বাঙালি সংস্কৃতির এক অমর অমূল্য রত্ন। এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালি হৃদয়ের গভীর অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং জীবনের নানা রঙ ও সৌন্দর্য। প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ভালো বাংলা কবিতার বিস্তৃত পরিসর আমাদের সাহিত্যিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।



স্বাধীনতার সুখ"

রজনীকান্ত সেন

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই-
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা 'পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।''
বাবুই হাসিয়া কহে- “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়;
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।'


==========================================

কাজলা দিদি
যতীন্দ্রমোহন বাগচী


বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে,
থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?
সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?

খাবার খেতে আসি যখন
দিদি বলে ডাকি তখন,
ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?
আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?
বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?
কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!

দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক’রে রবে?
আমিও নাই—দিদিও নাই—কেমন মজা হবে!
ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,
মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল |

ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে
বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,
উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,
দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্ |
বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?

লেবুর তলে পুকুর পাড়ে
ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,—
রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?



পাখি সব করে রব
 মদনমোহন তর্কালঙ্কার

পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।।
শীতল বাতাস বয় জুড়ায় শরীর।
পাতায়-পাতায় পড়ে নিশির শিশির।।
ফুটিল মালতী ফুল সৌরভ ছুটিল।
পরিমল লোভে অলি আসিয়া জুটিল ॥


গগনে উঠিল রবি সোনার বরণ।
আলোক পাইয়া লোক পুলকিত মন ॥
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে ॥
উঠ শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ।
আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ ॥

============================

হাসি 
রোকনুজ্জামান খান


হাসতে নাকি জানেনা কেউ
কে বলেছে ভাই?
এই শোন না কত হাসির
খবর বলে যাই।

খোকন হাসে ফোঁকলা দাঁতে
চাঁদ হাসে তার সাথে সাথে
কাজল বিলে শাপলা হাসে
হাসে সবুজ ঘাস।

খলসে মাছের হাসি দেখে
হাসে পাতিহাঁস।
টিয়ে হাসে, রাঙ্গা ঠোঁটে,
ফিঙ্গের মুখেও হাসি ফোটে
দোয়েল কোয়েল ময়না শ্যামা
হাসতে সবাই চায়
বোয়াল মাছের দেখলে হাসি
পিলে চমকে যায়।

এত হাসি দেখেও যারা
গোমড়া মুখে চায়,
তাদের দেখে পেঁচার মুখেও
কেবল হাসি পায়।

==============================


সফদার ডাক্তার
-হোসনে আরা

সফদার ডাক্তার মাথাভরা টাক তার
খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে, 
চেয়ারেতে রাতদিন বসে গোণে দুই-তিন
পড়ে বই আলোটারে নিভিয়ে।

ইয়া বড় গোঁফ তার, নাই যার জুড়িদার
শুলে তার ভুঁড়ি ঠেকে আকাশে,
নুন দিয়ে খায় পান, সারাক্ষণ গায় গান
বুদ্ধিতে অতি বড় পাকা সে।

রোগী এলে ঘরে তার, খুশিতে সে চারবার
কষে দেয় ডন আর কুস্তি,
তারপর রোগীটারে গোটা দুই চাঁটি মারে
যেন তার সাথে কত দুস্তি।

ম্যালেরিয় হলে কারো নাহি আর নিস্তার
ধরে তারে কেঁচো দেয় গিলিয়ে,
আমাশয় হলে পরে দুই হাতে কান ধরে
পেটটারে ঠিক করে কিলিয়ে।

কলেরার রোগী এলে, দুপুরের রোদে ফেলে
দেয় তারে কুইনিন খাইয়ে,
তারপর দুই টিন পচা জলে তারপিন
ঢেলে তারে দেয় শুধু নাইয়ে।

ডাক্তার সফদার, নাম ডাক খুব তার
নামে গাঁও থরথরি কম্প,
নাম শুনে রোগী সব করে জোর কলরব
পিঠটান দিয়ে দেয় লম্ফ।

একদিন সককালে ঘটল কি জঞ্জাল
ডাক্তার ধরে এসে পুলিশে,
হাত-কড়া দিয়ে হাতে নিয়ে যায় থানাতে
তারিখটা আষাঢ়ের উনিশে।

=============================================

বৃষ্টির ছড়া
  -ফররুখ আহমদ

বিষটি এল কাশ বনে
জাগল সাড়া ঘাস বনে,
বকের সারি কোথা রে
লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।


নদীতে নাই খেয়া যে,
ডাকল দূরে দেয়া যে,
কোন সে বনের আড়ালে
ফুটল আবার কেয়া যে।


গাঁয়ের নামটি হাটখোলা,
বিষটি বাদল দেয় দোলা,
রাখাল ছেলে মেঘ দেখে,
যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা।


মেঘের আঁধার মন টানে,
যায় সে ছুটে কোন খানে,
আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে
আমন ধানের দেশ পানে।



প্রাচীন যুগের কবিতা

জনপ্রিয় বাংলা কবিতার শেকড় প্রাচীন যুগে রোপিত। চর্যাপদ, যা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত, সেই যুগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত। এই কবিতাগুলোয় ধর্মীয় ভাবধারা এবং জীবনদর্শন প্রকাশ পেয়েছে।


মধ্যযুগের কবিতা

মধ্যযুগে বাংলা কবিতা আরও বিকশিত হয়। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এই যুগের প্রধান সাহিত্যকর্ম হিসাবে বিবেচিত। বৈষ্ণব পদাবলীতে শ্রীচৈতন্য এবং তাঁর ভক্তদের রচিত ভক্তিমূলক কবিতা অন্যতম। বিদ্যাপতি এবং চণ্ডীদাসের প্রেমমূলক পদাবলী এই যুগের প্রেমের কবিতায় বিশেষ স্থান অধিকার করে।


আধুনিক যুগের কবিতা

বাংলা আধুনিক কবিতার যুগের সূচনা উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, এবং শামসুর রাহমান সহ বহু কবি বাংলার কবিতার নবজাগরণের সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রেম, প্রকৃতি, এবং মানবতাবোধের মেলবন্ধন, যেখানে নজরুলের কবিতা বিদ্রোহ, সাম্য এবং প্রেমের মিশ্রণে ঋদ্ধ। জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমাদের নিয়ে যায় গ্রামবাংলার নিসর্গ এবং নাগরিক জীবনের গভীরে।


আধুনিক পরবর্তী কবিতা

আধুনিক পরবর্তী সময়ে বাংলার কবিরা আরও বহুমুখী হয়ে ওঠে। সত্তর দশকের কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবুল হাসান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় বাংলা কবিতার রচয়িতা । তাদের কবিতায় সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ কবিদের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় নতুন ধরণের ভাবনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা।


বাংলা কবিতার বৈশিষ্ট্য

বাংলা কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর সুর এবং ছন্দ। ছন্দময়তা, অলঙ্কার, এবং শব্দচয়নে দক্ষতা বাংলা কবিতাকে করেছে সমৃদ্ধ। এছাড়াও, বাংলার কবিতার বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, মানবিক অনুভূতির গভীরতা, এবং প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


উপসংহার

বাংলা কবিতা কেবলমাত্র শব্দের সমষ্টি নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতির হৃদস্পন্দন, জীবনদর্শন এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশ। প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এর ধারাবাহিকতা বাংলা সাহিত্যের এক অমর অধ্যায়। বাংলার কবিতা, বাংলার গর্ব। ফলে আধুনিক জনগন বাংলা কবিতা আবৃত্তি ও বাংলা কবিতা ক্যাপশন চিঠি ও এস এম এসের মাধ্যমে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতে ভালোবাসে। 



Share:

0 comments:

Post a Comment